আল্যা সর্বব্যাপী – তিনি বরাহেও আছেন, বিষ্ঠাতেও আছেন # আল্যা সর্বব্যাপী – তিনি বোরখাতেও আছেন, বিকিনিতেও আছেন # আল্যা সর্বব্যাপী – তিনি জলাশয়েও আছেন, মলাশয়েও আছেন # আল্যা সর্বব্যাপী – তিনি উটমূত্রেও আছেন, কামসূত্রেও আছেন # আল্যা সর্বব্যাপী – তিনি আরশেও আছেন, ঢেঁড়শেও আছেন # আল্যা সর্বব্যাপী – তিনি হাশরেও আছেন, বাসরেও আছেন

মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭

মুহাম্মদের চিঠি-১২: উম্মে হাবিবার দুর্ব্যবহার ও নবীর আদর্শ! কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ১৭৩): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত সাতচল্লিশ

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী এখানে) (ইন্টারন্যাল লিংকে যাতায়াতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে: সমাধানের চেষ্টা চলছে; আপাতত প্রক্সি ব্যবহারে লিংকে গমন সহজ হবে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।"

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) আবিসিনিয়ার শাসনকর্তা আল-নাজ্জাসীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন ৬২৭ সালের শেষার্ধে (পর্ব-১৭০), আর তিনি তাঁর অনুসারীদের আবিসিনিয়ার হিজরত করার আদেশ জারী করেছিলেন ৬১৫-৬১৬ খ্রিস্টাব্দে। মুহাম্মদের ধর্মে দীক্ষিত না হওয়া সত্বেও আবিসিনিয়ার শাসনকর্তা নাজ্জাসী তার রাজ্যে আগত এই নব্য ইসলাম অনুসারীদের শুধু যে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন তাইই নয়, তিনি তাদের প্রতি কীরূপ হৃদ্যতা প্রদর্শন, সহানুভূতিশীল ও সহনশীল আচরণ করেছিলেন; মুহাম্মদের এই চিঠি-টি পাওয়ার পর নাজ্জাসী কী ভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন; তিনি তার পুত্রের সঙ্গে যে সত্তর জন আদি ইথিওপিয়াবাসীদের (আল তাবারী: '৬০জন ইথিওপিয়ানদের একটি দল’ [1]) মুহাম্মদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, পথিমধ্যে তাদের কী পরিণতি হয়েছিল; ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1]
‘মুহাম্মদ বিন উমর (আল-ওয়াকিদি) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: 'আল্লাহর নবী নিগাসের কাছে এই মর্মে খবর পাঠান যে তিনি যেন আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবিবার সঙ্গে তাঁর [নবীর] বিবাহের ব্যবস্থা করেন, অতঃপর তিনি যেন তার ওখানে যে মুসলমানরা আছে তাদের সঙ্গে তাকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেন। বিবাহের এই প্রস্তাব-টি উম্মে হাবিবা-কে জানানোর জন্য নিগাস তার এক ক্রীতদাসীকে তার কাছে প্রেরণ করেন, যার নাম ছিল আবরাহা (Abrahah)। এই খবরটি শোনার পর উম্মে হাবিবা আনন্দে এতই আত্মহারা হয়ে ওঠেন যে তিনি আবরাহা-কে তার কিছু রুপার অলংকার ও একটি আংটি প্রদান করেন।

নিগাস উম্মে হাবিবা-কে আদেশ করেন যে তিনি যেন তার পক্ষে কোন এক লোককে তার প্রতিনিধিরূপে নিযুক্ত করেন, যে তাকে বিবাহ দেবে। তাই তিনি [উম্মে হাবিবা] খালেদ বিন সাইদ বিন আল-আস (Khalid b. Said b. al-As) কে তার পক্ষে নিযুক্ত করেন। সে তাকে বিবাহ দেয়: আল্লাহর নবীর পক্ষে কথা বলে নিগাস ও (উম্মে হাবিবার পক্ষে) কথা বলে খালিদ, সে উম্মে হাবিবা-কে বিবাহ দেয়। নিগাস নববধূ-কে ৪০০ দিনার উপহার স্বরূপ দেবার ঘোষণা করেন ও তিনি তা খালিদ বিন সাইদের কাছে হস্তান্তর করেন। যখন এই অর্থ উম্মে হাবিবার হাতে পৌঁছে, আবরাহা ছিল সেই মহিলা যে এটি তার কাছে নিয়ে এসেছিল, উম্মে হাবিবা তাকে ৫০ মিথকাল (mithqal) প্রদান করেন ও বলেন, "যখন আমার কাছে কিছুই ছিল না তখন আমি তোমাকে ওগুলো (ওপরে উদ্ধৃত 'রুপার অলংকার ও একটি আংটি') প্রদান করেছিলাম, কিন্তু পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত আল্লাহ এখন এগুলো আমার জন্য এনেছে!" [2]

আবরাহা বলে, "রাজার আদেশ এই যে আমি যেন আপনার কাছ থেকে কোন কিছু না নেই ও যে জিনিসগুলো আমি নিয়েছি, তা যেন আপনাকে ফেরত দিই" - অতঃপর সে তাকে তা ফেরত দেয়। [বলে] "রাজার দেয়া অলঙ্কার ও পোশাকই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি বিশ্বাস করি যে মুহাম্মদ আল্লাহর প্রেরিত রসুল ও তাঁর প্রতি আমার আস্থা। আপনার প্রতি আমার একমাত্র অনুরোধ এই যে, আপনি তাঁকে আমার সালাম জানাবেন।" উম্মে হাবিবা বলেন যে তিনি তা করবেন। (আবরাহা বলে) "রাজা তার স্ত্রীদের এই আদেশ করেছেন যে তাদের কাছে যে ঘৃতকুমারী কাঠ ও অম্বরের সুগন্ধি আছে, তারা যেন তা আপনার কাছে পাঠিয়ে দেয়।" আল্লাহর নবী উপলব্ধি করেন যে এগুলো তিনি [উম্মে হাবিবা] ব্যবহার করেন ও তার বাসস্থানে মজুদ রাখেন; কিন্তু তিনি তা অপছন্দ (disapprove) করেন নাই।'
 
উম্মে হাবিবা হইতে বর্ণিত, যিনি বলেছেন: 'তিনি আমাদের সাথে নাবিকদের প্রেরণ করেন ও আমরা দুটি বড় নৌকাতে (Ship) চড়ে যাত্রা করি। আমরা আল-জার (al-Jar) নামক স্থানে অবতরণ করি ও পশুর পিঠে চড়ে মদিনায় পৌঁছোই। আমরা জানতে পাই যে আল্লাহর নবী খায়বারে অবস্থান করছেন কিছু লোক তাঁর কাছে গমন করে। [3] [4] আমি মদিনায় অবস্থান করি যতদিনে না আল্লাহর নবী ফিরে আসেন, অতঃপর আমি তার সান্নিধ্যে আসি। তিনি আমাকে নিগাস সম্বন্ধে প্রশ্ন করেন। আমি তাঁকে আবরাহার অভিবাদন জানাই ও তিনি তার জবাব দেন।' আবু-সুফিয়ান যখন জানতে পারেন যে আল্লাহর নবী উম্মে হাবিবা-কে বিবাহ করেছেন, তিনি বলেন, "ঐ মদ্দা ঘোড়াটার প্রবৃত্তি সংযত হবার নয় (That stallion' s nose is not to be restrained)!”

আল-তাবারীর আরও বিস্তারিত বর্ণনা: [5]
'উম্মে হাবিবা, যার (প্রকৃত) নাম ছিল রামলাহ বিনতে আবু-সুফিয়ান ইবনে হারব (Ramlah bt. Abi Sufyan)। তার মা ছিলেন উসমান ইবনে আফফানের চাচী, নাম সাফিয়া বিনতে আবি আল-আস বিন উমাইয়া বিন আবদ শামস। উম্মে হাবিবা-কে বিবাহ করে হারব বিন উমাইয়ার মিত্র উবায়েদুল্লাহ বিন জাহাশ বিন রিয়াব (Ubaydallah b. Jahsh b. Ri'ab)। তার গর্ভে জন্ম লাভ করে হাবিবা, যার নাম অনুসারে তার নামকরণ। হাবিবা (পরবর্তীতে) বিবাহ করে দাউদ বিন উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি কে। [6] [7]

[দাউদের মাতার নাম আমিনা বিনতে আবু-সুফিয়ান; তার পিতা উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি ছিলেন থাকিফ গোত্রের এক বিশিষ্ট গোত্র-নেতা - যিনি হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির সময়টি-তে (পর্ব-১১৫) কুরাইশদের পক্ষের প্রতিনিধি হিসাবে মুহাম্মদের সাথে কথা বলার জন্য তাঁর শিবিরে গমন করেছিলেন।]

উবায়েদুল্লাহ বিন জাহাশ দ্বিতীয় হিজরতের সময় উম্মে হাবিবাকে সঙ্গে নিয়ে আবিসনিয়ায় হিজরত করেন। অতঃপর তিনি তার ধর্মত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন ও আবিসিনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। পক্ষান্তরে উম্মে হাবিবা তার ইসলাম ধর্ম ও প্রবাসী পদমর্যাদায় বিশ্বস্ত থাকেন। উম্মে হাবিবা যখন আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন, তখন তিনি তার কন্যা হাবিবা বিনতে উবায়েদুল্লাহ-কে সঙ্গে নিয়ে আসেন; পরে তিনি তাকে নিয়ে আবার মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন।’

ইবনে উমর (আল-ওয়াকিদি) <আবদুল্লাহ বিন জাফর <উসমান বিন মুহাম্মদ আল-আখনাসি (Uthman b. Muhammad al-Akhnas) হইতে বর্ণিত: 'উম্মে হাবিবা বিনতে আবু-সুফিয়ানের গর্ভে উবায়েদুল্লাহ বিন জাহাশের ঔরসজাত কন্যা হাবিবার জন্ম হয় মক্কায়, সেটি ছিল তার আবিসিনিয়ায় হিজরতের পূর্বে।'

ইবনে উমর (আল-ওয়াকিদি) <আবু বকর বিন ইসমাইল বিন মুহাম্মদ বিন সা'দ < তার পিতা হইতে বর্ণিত: 'উম্মে হাবিবা গর্ভবতী অবস্থায় মক্কা ত্যাগ করেন ও তার কন্যার জন্মদান করেন আবিসিনিয়ায়।'

ইবনে উমর (আল-ওয়াকিদি) <আবদুল্লাহ বিন আমর বিন যুহায়ের <ইসমাইল বিন আমর বিন সাইদ বিন আল-আ'স < উম্মে হাবিবা হইতে বর্ণিত: 'আমি স্বপ্নে যা দেখেছিলাম তা হলো এই যে আমার স্বামী উবায়েদুল্লাহ বিন জাহাশের অবস্থা খুবই শোচনীয় ও তার আকৃতি খুবই বিকৃত। আমি ভীত হয়ে (নিজেকে) বলি, "আল্লাহর কসম, তার পরিবর্তন হয়েছে।" অতঃপর দেখি কি, সে সকালে ঘুম থেকে উঠে, বলে, "এই উম্মে হাবিবা, আমি ধর্মের (বিষয়) নিয়ে চিন্তা করেছি ও দেখেছি যে খ্রিস্টান ধর্মের চেয়ে ভাল আর কোন ধর্ম নেই। আমি তা (পূর্বে) বিশ্বাস করতাম, অতঃপর আমি মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করেছি, আর এখন আমি আবার খ্রিস্টান ধর্মে ফিরে যাচ্ছি।" আমি বলি, "আল্লাহর কসম, তুমি সৌভাগ্যবান নও", অতঃপর আমি তাকে তার সম্বন্ধে আমার স্বপ্নের কথা বলি, কিন্তু সে তাতে কোন মনোযোগ না দিয়ে মদ্যপান অব্যাহত রাখে যতদিনে না তার মৃত্যু হয়। [8] অতঃপর আমি স্বপ্নে দেখি, কে যেন আমার কাছে এসে বসেছে ও বলছে, "হে উম্মুল মুমেনীন।" আমি ভীত হয়ে পড়ি ও এর ব্যাখ্যা এ ভাবে করি যে (এটি একটি সংকেত] যার মানে হলো এই যে. আল্লাহর নবী আমাকে বিবাহ করতে পারেন। অতঃপর, প্রকৃতপক্ষেই আমি দেখি যে আমার বিধিসম্মত সময়কাল (ইদ্দত) উত্তীর্ণ হওয়ার পরে ও আমি (কিছু) জানার আগেই, নিগাসের কাছ থেকে এক বার্তাবাহক আমার দরজার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে ও আমার ঘরের ভিতরে আসার অনুমতি প্রার্থনা করছে। যে এসেছে সে হলো তার ক্রীতদাসী, যার নাম ছিল আবরাহা ও যার দায়িত্ব ছিল তার পোশাক পরিচ্ছদ ও সুগন্ধি দ্রব্যাদির দেখাশোনা করা। সে ভিতরে আসে ও বলে, "রাজা মশাই আপনার কাছে যে বার্তা-টি পাঠিয়েছেন তা হলো: 'আল্লাহর নবী আমাকে লিখে জানিয়েছেন যে, আমি যেন তাঁর সঙ্গে তোমার বিবাহ দিই।’" আমি বলি, "আল্লাহ যেন তোমাকে সু-সংবাদ প্রেরণ করেন।" সে বলতে থাকে, "রাজা মশাই আপনাকে বলেছেন, 'তোমার পক্ষ থেকে কাউকে নিযুক্ত করো, যে তোমাকে বিবাহ দেবে।'"

উম্মে হাবিবা খালিদ বিন সাইদ বিন আল-আস কে ডেকে পাঠান ও তাকে এই দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। তার কাছে মেয়েটির আনা এই সংবাদে তিনি এতই আনন্দিত হোন যে তিনি আবরাহা-কে দু'টি রূপার ব্রেসলেট, দুটি নূপুর ও কিছু আংটি প্রদান করেন, যা তিনি তার পায়ে ও পায়ের আঙ্গুল গুলোতে পরিধান করতেন। [9]

জাফর বিন আবু তালিব ও অন্যান্য যে সমস্ত মুসলমানরা সেখানে ছিল, নিগাস তাদের-কে সন্ধ্যাকালে (উপস্থিত) থাকার অনুরোধ করেন; ফলে তারা তার সম্মুখে এসে হাজির হয়। নিগাস সেখানে বক্তৃতা করেন, বলেন: "প্রশংসা সেই ঈশ্বরের, যিনি মহাধিরাজ, পবিত্র, নির্ভুল, প্রতিজ্ঞা পালনে বিশ্বস্ত, সর্বদ্রষ্টা, সর্বশক্তিমান ও তেজস্বী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই ও মুহাম্মদ হলো তার সেবক ও বার্তাবাহক (রসুল) ও যার (আগমনের) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন মেরী পুত্র যিশু।[10] সম্প্রতি আল্লাহর নবী আমাকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন যে আমি যেন তাঁর সাথে উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানের বিবাহ দান করি। আমি আল্লাহর নবীর এই বাসনার সাথে সম্মতি প্রকাশ করছি ও তাকে দাম্পত্য-উপহার স্বরূপ ৪০০ দিনার প্রদান করছি।" অতঃপর তিনি লোকদের সামনে দিনারগুলো ঢেলে দেন। তারপর খালিদ বিন সাইদ বক্তব্য রাখেন ও বলেন, "আল্লাহর প্রতি প্রশংসা, আমি তার প্রশংসা আদায় করি, তার সাহায্য ও সহায়তা চাই ও সাক্ষ্য দিই যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই ও মুহাম্মদ হলো তার দাস ও রসুল। 'তিনিই হলেন সেই যে তার রসূলকে হেদায়েত ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে (অন্য) সমস্ত  ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত করেন, যদিও মুশরিকদের কাছে তা অপ্রীতিকর।'[11] আল্লাহর নবীর বাসনার সাথে একমত পোষণ করে আমি এখন তাঁর সঙ্গে উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানের বিবাহ দান করছি; আল্লাহ যেন তার রসূলকে আশীর্বাদ করে।" নিগাস খালিদ বিন সাইদ-কে দিনারগুলো প্রদান করেন, আর সে তা গ্রহণ করে। অতঃপর লোকেরা প্রস্থান করতে চায়, কিন্তু নিগাস বলেন, "বস, কারণ বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে নবীর রীতি (সুন্নাহ) হলো খাবার পরিবেশন করা।" তারপর তিনি খাবার আনার আদেশ করেন, তারা খাবার খায় ও অতঃপর প্রস্থান করে।

উম্মে হাবিবা হইতে বর্ণিত: যখন সেই অর্থ আমার কাছে পৌঁছে, আমি আবরাহা-কে ডেকে পাঠাই, সে আমার কাছে খবরটি নিয়ে এসেছিল; তাকে বলি, "ঐ দিন আমি তোমাকে যা দিতে পেরেছিলাম তা দিয়েছিলাম, কারণ তখন আমার কাছে কোন নগদ অর্থ ছিল না। এই যে এখানে পঞ্চাশটি স্বর্ণ-মুদ্রা (মিথকাল) আছে; এগুলো তুমি নাও ও প্রয়োজনে তা খরচ করো।" সে একটি বাক্স বের করে, যার ভিতরে আমি তাকে যা কিছু দিয়েছিলাম তার সবই ছিল; অতঃপর সে সেটি আমাকে ফেরত দেয় ও বলে, "রাজা মশাই আমাকে আপনার কাছ থেকে কোন কিছু নিতে নিষেধ করেছেন, আমি তার পোশাক ও সুগন্ধি দ্রব্যাদির দেখাশোনা করার দায়িত্ব প্রাপ্ত (চাকরানী)। আমি নবীর ধর্মে দীক্ষিত হয়েছি ও আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। রাজা মশাই তার স্ত্রীদের এই নির্দেশ দিয়েছেন যে তাদের কাছে যে পারফিউমগুলি আছে, তার সমস্তই যেন তারা আপনার কাছে পাঠিয়ে দেয়।" পরদিন আবরাহা আমার কাছে অত্যধিক পরিমাণ ঘৃতকুমারী, জাফরান, অম্বর ও গন্ধগোকুল (civet) সুগন্ধি-যুক্ত পারফিউম গুলো নিয়ে আসে। আমি (পরবর্তীতে) তার সবটিই নবীর কাছে নিয়ে আসি, তিনি আমাকে তা ব্যবহার করতে ও রাখতে দেখতেন; তিনি কখনোই তা অননুমোদন করেন নাই।

অতঃপর আবরাহা বলে, "আমি আপনার কাছে যে আনুকূল্য চাই তা হলো এই যে, আপনি আমার পক্ষ থেকে নবীকে অভিবাদন জানাবেন ও তাঁকে বলবেন যে আমি তাঁর ধর্ম অনুসরণ করি।" সে আমার সাথে খুবই নমনীয় ব্যবহার করেছিল; সে ছিল সেই যে আমাকে (যাত্রার জন্য) প্রস্তুত করেছিল; যখনই সে আমার কাছে আসতো, বলতো, "আমি আপনার কাছে যে অনুগ্রহের আবেদন করেছিলাম, তা যেন ভুলে না যান।" যখন আমরা নবীর কাছে চলে আসি, আমি তাঁকে আমার বাগদান (অনুষ্ঠান), আবরাহা ও আমার প্রতি তার আচরণের বিষয়ে বলি; তিনি মৃদুহাস্য করেন। আমি তার পক্ষ থেকে তাঁকে অভিবাদন জানাই, তিনি বলেন, "তার ওপরও শান্তি ও আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক।" -

---- ইবনে উমর (আল-ওয়াকিদি) <মুহাম্মদ বিন সালিহ আসিম বিন উমর বিন কাতাদা হইতে, আর এছাড়াও (ইবনে উমর আল-ওয়াকিদি) <আবদ আল-রহমান বিন আবদ আল-আযিয <আবদুল্লাহ বিন আবু বকর বিন হাযম হইতে বর্ণিত: যে ব্যক্তিটি উম্মে হাবিবা-কে বিবাহ প্রদান করেছিলেন ও যার কাছ থেকে নিগাস তাকে গ্রহণ করেছিলেন, তিনি ছিলেন খালিদ বিন সাইদ বিন আল আস; এই ঘটনা-টি সংঘটিত হয়েছিল [হিজরি] ৭ সালে (৬২৮-৬২৯ খ্রিস্টাব্দে)। যখন তাকে মদিনায় আনা হয়েছিল তখন তার বয়স ছিল ত্রিশ বছর। উম্মে হাবিবা মুয়াবিয়ার খেলাফতের সময় [হিজরি] ৪৪ সালে (এপ্রিল ৪, ৬৬৪ - মার্চ ২৪, ৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন।'

ইমাম আবু দাউদের (৮১৭ - ৮৮৯ সাল) বর্ণনা: [12]
‘উম্মে হাবিবা হইতে বর্ণিত: উম্মে হাবিবা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উরওয়াহ যা বিবৃত করেছেন তা হলো, তাকে বিবাহ দেওয়া হয় আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের সঙ্গে, যিনি মৃত্যুবরণ করেন আবিসিনিয়ায়; অতঃপর নিগাস তাকে আল্লাহর নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) সঙ্গে বিবাহ দান ও তাঁর পক্ষ থেকে তাকে যৌতুক (dower) বাবদ চার হাজার (দিরহাম) প্রদান করেন। তিনি তাকে শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ এর সঙ্গে আল্লাহর নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) কাছে প্রেরণ করেন।' আবু দাউদ বলেন: হাসানাহ হলো তার মা।

 - অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ - লেখক।

>>> আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, মক্কার সম্মানিত ও বিশিষ্ট কুরাইশ গোত্র-প্রধান আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র জাফর ইবনে আবু তালিব যেমন মুহাম্মদের আদেশে তাঁর কিছু অনুসারীদের সঙ্গে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, একইভাবে মক্কার আর এক অতি সম্মানিত ও বিশিষ্ট কুরাইশ গোত্র প্রধান আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কন্যা উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান ও তাঁর জামাতা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। "মক্কাবাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা আবিসিনিয়া ও মদিনায় হিজরত করেছিলেন" দাবীর যে আদৌ কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তার আরও একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের ওপরে বর্ণিত বর্ণনা।  কারণ:

“মক্কার এই বিশিষ্ট গোত্র প্রধানরা, কিংবা তাঁদের নিজ গোত্রের কোন অবিশ্বাসী সদস্যরা,  কিংবা মক্কায় অবস্থিত অন্যান্য গোত্রের কোন অবিশ্বাসী সদস্য তাঁদের এই ধর্মান্তরিত সন্তানদের প্রতি কখনো কোন অত্যাচার করেছিলেন, এমন ইতিহাস আদি উৎসের কোথাও বর্ণিত হয় নাই। অন্যদিকে, মুহাম্মদের ধর্মে দীক্ষিত না হওয়া সত্বেও আবু তালিব কীরূপে তাঁর ভাতিজা মুহাম্মদ-কে সর্বাবস্থায় সর্বাত্মক সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন, তার বর্ণনা আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় অত্যন্ত স্পষ্ট (পর্ব-৪১)! আবু সুফিয়ান (ও তাঁর স্ত্রী হিন্দ বিনতে ওতবা) তাঁর হানজালা নামের এক সন্তান, শ্বশুর ও চাচা শ্বশুর-কে অমানুষিক নৃশংসতায় হত্যার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর মুসলিম কন্যা জয়নাব-কে মদিনায় তাঁর পিতার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য কীরূপে প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন, তার প্রাণবন্ত বর্ণনাও আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকরা লিখে রেখেছেন (বিস্তারিত: পর্ব-৩৯)! তৎকালীন আরবের লোকেরা শুধুমাত্র ভিন্ন ধর্ম মতাবলম্বী হওয়ার কারণে কোনও ব্যক্তি বা জনপদের লোকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অসম্মান, দোষারোপ, হুমকি-শাসানী, ভীতি-প্রদর্শন করতেন; কিংবা সে কারণে তাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী আক্রমণ, খুন, জখম, লুট (গণিমত), দমন, নিপীড়ন ও দাস ও দাসী-করণের মত গর্হিত কর্ম কাণ্ডে লিপ্ত হতেন, এমন দাবী সম্পূর্ণ অসত্য (পর্ব-৮২)!”

আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের ওপরে বর্ণিত বর্ণনা ও গত-পর্বের বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি তা হলো, আবু তালিব ও আবু-সুফিয়ানের মতই, মুহাম্মদের ধর্মে দীক্ষিত না হওয়া সত্বেও আল-নাজ্জাসী মুহাম্মদ অনুসারীদের প্রতি ছিলেন সদয়, সহনশীল ও সাহায্যকারী। অন্যদিকে, মুহাম্মদ-কে নবী হিসাবে অস্বীকারকারী কোন ব্যক্তি ও জনগুষ্ঠির প্রতি মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা কীরূপ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, শাপ-অভিশাপ (পর্ব: ১১-১২) ও ঘৃণা প্রদর্শন করতেন; মুহাম্মদের মতবাদের সমালোচনাকারী ও বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি মুহাম্মদের ও তাঁর অনুসারীরা কীরূপ অমানুষিক পাশবিকতা প্রদর্শন করতেন, তা মুহাম্মদেরই রচিত ব্যক্তি-মানস জীবনী গ্রন্থ ‘কুরান’ ও আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচিত 'সিরাত ও হাদিস গ্রন্থের' অসংখ্য বর্ণনায় অত্যন্ত স্পষ্ট!

আল-তাবারী ও মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনা: [13] [14]
'-----অতঃপর আবু সুফিয়ান মুহাম্মদের সঙ্গে দেখা করার জন্য মদিনায় গমন করেন। আবু সুফিয়ান (প্রথমে) তার কন্যা উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। যখন তিনি আল্লাহর নবীর বিছানায় ওপর বসতে যাচ্ছিলেন, সে তাকে থামানোর জন্য তা গুটিয়ে ফেলে। তিনি বলেন, "হে আমার কন্যা, আল্লাহর কসম, আমি জানিনা তুই আমাকে এই বিছানাটির চেয়ে বেশী ভাল মনে করিস, না কী তুই মনে করিস যে এই বিছানা-টিই আমার চেয়ে বেশী ভাল।" সে বলে, "এই বিছানা-টি হলো আল্লাহর নবীর, আর তুমি হলে এক অপবিত্র মুশরিক। আমি চাই নাই যে তুমি আল্লাহর নবীর বিছানায় বসো।" তিনি বলেন, "হে আমার কন্যা, আল্লাহর কসম, আমাকে ছেড়ে আসার পর অসৎ-মানসিকতা তোর ওপর চেপে বসেছে।"   

(--- ‘Abu Sufyan then set out and went to the Messenger of God in Medina. Abu Sufyan [first] visited his own daughter, Umm Habibah bt. Abi Sufyan.  When he was about to sit on the bed of the Messenger of God, she folded it up to stop him. He said, "My daughter, by God, I don't know whether you think I am too good for this bed or you think it is too good for me." She said: "It is the bed of the Messenger of God, and you are an unclean polytheist. I did not want you to sit on the bed of the Messenger of God." He said, "My daughter, by God, evil came over you after you left me."’)

>> আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি: নবী পত্নী উম্মে হাবিবা যে কারণে তার পিতা-কে ‘অপবিত্র’ আখ্যা দিয়ে চরম অবমাননা ও অসম্মান প্রদর্শন করেছিলেন, তা হলো তার পিতার ধর্ম (মুশরিক)! উক্ত ঘটনাটি ঘটেছিল সেই সময়ে, যখন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে দশ বছর  মেয়াদি 'হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি' সম্পন্ন করার পর, পরবর্তী দুই বছরের কম সময়ে 'পঞ্চম বার চুক্তি ভঙ্গ (পর্ব-১২৯)’ করার অজুহাত খুঁজে পেয়েছিলেন; আর আবু-সুফিয়ান মুহাম্মদের আগ্রাসী আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রচেষ্টায় মুহাম্মদের সঙ্গে কথা বলার জন্য মদিনায় গমন করেছিলেন। নিজ জন্মদাতা পিতার প্রতি উম্মে হাবিবার এই দুর্ব্যবহার ও তাচ্ছিল্যে সম্পূর্ণরূপে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর আদর্শ ও তাঁর প্রবর্তিত ইসলাম নামক মতবাদের একান্ত মৌলিক শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ! মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর আল্লাহর নামে তাঁকে অবিশ্বাসকারী, তাঁর মতবাদের সমালোচনা-কারী ও তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদকারী যে কোন ব্যক্তি বা জন-গুষ্ঠির বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ ২৩ বছরব্যাপী কী পরিমাণ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অসম্মান, দোষারোপ, হুমকি, শাসানী ও ভীতি-প্রদর্শন করেছিলেন, তা তাঁরই রচিত কুরানের পাতায় পাতায় বর্ণিত আছে (পর্ব: ২৬-২৭)! “জালেম, মিথ্যাবাদী, মূক ও বধির, মুর্খ, অন্ধ, নাফরমান, বানর, শুকর, তাদের অবস্থা কুকুরের মত, তারা শয়তানের মত, তারা শয়তানের ভাই, তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত বা তার চেয়েও নিকৃষ্টতর, তারা কঠিন ঝগড়াটে, নির্বোধ, কান্ডজ্ঞানহীণ, বিবেক বুদ্ধিহীন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী, সীমালংঘনকারী, লোভী”; ইত্যাদি এমন কোন কুরুচিপূর্ণ শব্দ নাই যা মুহাম্মদ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেন নাই। 

মুহাম্মদের ভাষায় (কুরান):
৯:২৮ “হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল-হারামের নিকট না আসে।”
>> মুশরিকরা যে "অপবিত্র", সে শিক্ষা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর!  উম্মে হাবিবা তার মুশরিক পিতার প্রতি যে অসদাচরণ করেছিলেন, তা ছিল মুহাম্মদের আদর্শ ও শিক্ষার বাস্তবায়ন!

৯:২৩ - “হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী।
>> আল্লাহর লেবাসে শিষ্যদের প্রতি মুহাম্মদের কঠোর নির্দেশ, তারা যেন কোন অবস্থাতেই কোন 'অবিশ্বাসী-কে' তাদের অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ না করে! এমন কী সেই ব্যক্তিটি যদি তাদের পিতা-মাতা, ভাই-ভগ্নী বা একান্ত নিকট আত্মীয়ও হয়, তবুও নয়! যে ব্যক্তি তাঁর এই আদেশের অন্যথা করবে, তার প্রতি মুহাম্মদের কঠোর হুশিয়ারি, "তারা সীমালংঘনকারী!” একজন নিবেদিত প্রাণ মুহাম্মদ অনুসারী হিসাবে উম্মে হাবিবা তাঁর গুরুর শিক্ষার বাস্তবায়ন করেছিলেন মাত্র! 

৯:২৪ -  "বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান - যাকে তোমরা পছন্দ কর - আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।" 
>> আল্লাহর লেবাসে মুহাম্মদ ঘোষণা দিচ্ছেন, তাঁর শিষ্যদের অবশ্য কর্তব্য হলো এই যে তারা "তাঁকে" তাদের নিজ জন্মদাতা পিতা-মাতা, দাদা-নানা, ভাই-ভগ্নী বা যে কোন নিকট-আত্মীয়দের চেয়েও "অধিক ভালবাসা প্রদান করবে!” যে মা তাঁর সন্তানদের ২৭০-২৯০ দিন পেটে ধরেছেন, সন্তান প্রসবের নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, যে পিতা-মাতা ও একান্ত নিকট-আত্মীয়রা সন্তানদের শিশুকালের অসহায় অবস্থায় স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে লালন পালন করেছেন; মুহাম্মদের নির্দেশ হলো, এই সব একান্ত প্রিয়জনদের ভালবাসা ও অনুগ্রহ-কে উপেক্ষা করে "মুহাম্মদ-কে অবশ্যই বেশী ভালবাসতে হবে!” শুধু তাইই নয়, মুহম্মদের নির্দেশ হলো: প্রয়োজনে ‘তাঁর রাহে (পক্ষে)’ তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করতে হবে। আর এই আদেশ যদি তারা অমান্য করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের কঠোর হুশিয়ারি, তবে অপেক্ষা কর!’

এখানেই শেষ নয়। মুহাম্মদের শিক্ষা:
৯:১১৩: "নবী ও মুমিনের উচিত নয় মুশরেকদের মাগফেরাত কামনা করে, যদিও তারা আত্নীয় হোক একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা দোযখী।"
>> শিষ্যদের প্রতি মুহাম্মদের নির্দেশ, তাদের এই অবিশ্বাসী একান্ত নিকট আত্মীয়দের মৃত্যুর পর তারা যেন তাদের রুহের মাগফেরাত ও কামনা না করে। মৃত্যুর পরও 'এই অবিশ্বাসীরা’ যেন তাদের সন্তানদের কাছ থেকে কোনরূপ করুণা না পান, তা মুহাম্মদ নিশ্চিত করেছেন 'আল্লাহ' নামের মুখোশের আড়ালে! (সহি বুখারী: ৬:৬০:১৯৭) [15]

সুরা তওবার এই নির্দেশগুলোই হলো অনুসারীদের প্রতি মুহাম্মদের সর্বশেষ নির্দেশ-যুক্ত সুরা (বিস্তারিত: 'The Devil is in the Detail!’[পর্ব-১১৩])। ক্ষমতার লিপ্সায় মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ কী ভাবে তাঁর "আল্লাহ নামের মুখোশের আড়ালে" সন্তানদের তাদের পিতা-মাতা-আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে পিতা-মাতা-আত্মীয়-স্বজনদের তাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলেন, তার উদাহরণ হয়ে আছে তাঁরই স্ব-রচিত এই বাণীগুলো।

[কুরানের উদ্ধৃতি সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হারাম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা  থেকে নেয়া, অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর।  কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি বিভিন্ন ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ এখানে]

(চলবে)
তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী, ভলুউম ৮; ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫৭০-১৫৭১; বিনামূল্যে ডাউনলোড লিঙ্ক:
[2] ‘মিথকাল - সাধারণভাবে মিথকাল হলো দিনারের প্রতিশব্দ, যদিও এই শব্দটি ছোট মুদ্রা অর্থে ব্যবহার করা হতে পারে।’
[3] Ibid আল-তাবারী ভলুউম ৮, নোট নম্বর ৪৬৬ 
- 'আল-জার (al-Jar) - ছিল বর্তমান ইয়ানবুর (Yanbu) দক্ষিণে বুরাইকাহ (Buraykah) উপসাগর উপকূলে অবস্থিত লোহিত সাগরের একটি বন্দর, মদিনা থেকে একদিনের পথ।’
[4] অনুরূপ বর্ণনা: সহি বুখারী: ভলুম ৫, বই নম্বর ৫৯, হাদিস নম্বর ৫৩৯:
অনুরূপ বর্ণনা: “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৬৮৩; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩৩৬
[5] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী, ভলুউম ৩৯; ইংরেজী অনুবাদ: Ella Landau-Tasseron, The Hebrew University of Jerusalem, Published by State University of New York Press, Albany © 1998, ISBN 0-7914-2819-2 (alk. paper). - ISBN 0-7914-2820-6 (pbk); পৃষ্ঠা (Leiden) ২৪৪৪-২৪৪৭; বিনামূল্যে ডাউনলোড লিঙ্ক:
[6] Ibid আল-তাবারী, ভলুউম ৩৯, নোট নম্বর- ৭৯৫
- ‘উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি ছিলেন থাকিফ গোত্রের এক বিশিষ্ট গোত্র-নেতা, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, যে কারণে তার সহকর্মী সর্দাররা তাকে হত্যা করে।’
[7] “সিরাত রসুল আল্লাহ”-লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৫৮৯
- ‘উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফির স্ত্রী আমিনা বিনতে আবু-সুফিয়ানের গর্ভজাত পুত্রই হলো হাবিবার স্বামী দাউদ বিন উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি।’
[8] Ibid আল-তাবারী, ভলুউম ৩৯, নোট নম্বর- ৭৯৬
'এখানে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে মদ্যপান বিষয়টি ব্যবহৃত হয়েছ। এটি উম্মে হাবিবার স্বপ্ন দর্শনের সাথেও সম্পর্ক যুক্ত, যেখানে উম্মে হাবিবা তার স্বামীকে বিকৃত অবস্থায় দেখেছে। উপমা - কুরান: ৫: ৫৯-৬১’।
[9] Ibid আল-তাবারী, ভলুউম ৩৯, নোট নম্বর -৮০০
‘খালিদ বিন সাইদ বিন আল-আস ছিলেন উম্মে হাবিবার আত্মীয়। উমাইয়া গোত্রের যে অতি অল্প সংখ্যক লোকেরা ইসলামের প্রাথমিক যুগে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের একজন।’
[10] অনুরূপ বাক্য - কুরান: ৫৯:২৩
[11] অনুরূপ বাক্য - কুরান: ৯:৩৩ ৬১:৯।
[12] সুন্নাহ আবু দাউদ, বই নম্বর ৫, হাদিস নম্বর ২১০২ ও ২১০৩:
[13] Ibid আল-তাবারী, ভলুউম ৮, পৃষ্ঠা (Leiden) ১৬২৩
[14] অনুরূপ বর্ণনা: Ibid “সিরাত রসুল আল্লাহ”- মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, পৃষ্ঠা ৫৪৩
[15] সহি বুখারী: ভলুম ৬, বই নং ৬০, হাদিস নং ১৯৭

 

৩টি মন্তব্য:

  1. কোরানে অনেক আয়াত আছে যেগুলো প্রমাণ করে, যেই আল্লা সেই মোহাম্মদ।
    ৯:৩ – “আর মহান হজ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরেকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রসূলও।
    ৯:৭- “মুশরিকদের চুক্তি আল্লাহর নিকট ও তাঁর রসূলের নিকট কিরূপে বলবৎ থাকবে।
    এমন আরো অনেক।
    তা মুমিনদের চোখে পড়েনা কেন?
    -TTSG.

    উত্তর দিনমুছুন
  2. আমি আপনার সিরিজটি পড়ে যাচ্ছি। পর্ব ১৬ ঃ কুরানের অ্যানাটমি।। এই পর্বে আপনি বলেছেন “অবিশ্বাসিদের হুমকি, ভীতি, অসম্মান, অভিশাপ ইত্যাদি নিয়ে কোরানে মোট ১৯৫৮ টি আয়াত রয়েছে”।। এই আয়ত গুলোর তালিকা বেক্তিগত কারনে আপনি যদি আমাকে আয়াত গুলোর লিস্ট দিতেন তাহলে আমার খুব উপকার হত।। আমার বিশ্বাস আপনি আমাকে সাহায্য করে বাধিত করবেন।

    উত্তর দিনমুছুন
  3. দুঃখিত! আপনার মন্তব্যটি আজকেই খেয়াল করলাম। পর্ব-১৬ তে বলা হয়েছে:

    "পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, মক্কায় মোট ৪৭০৪ টি আয়াতের কমপক্ষে ১২৪০টি পুরাকালের উপকথা (২৬.৩ শতাংশ) । অর্থাৎ মক্কায় প্রবক্তা মুহাম্মদের প্রতি চারটি বাক্যের একটি হলো পুরাকালের নবীদের উপকথা। তার সাথে হুমকি-শাসানী-ভীতি প্রদর্শন-অসম্মান এবং হামলা-খুন-সম্পর্কচ্ছেদ ও অভিশাপ আদেশ সমন্বয়ে মোট আয়াত সংখ্যা (১২৪০+৫২১+১৫১+৬৬) = ১৯৫৮ টি, যা সমগ্র কুরানের ৩১.৩ শতাংশ। অর্থাৎ সমগ্র কুরানের প্রতি তিনটি বাক্যের একটি হুমকি-শাসানি-ত্রাস অথবা পুরাকালের নবীদের গল্প সম্বলিত।"

    অর্থাৎ, বক্তব্যের সারাংশ অনুযায়ী কুরানের আয়াতগুলোর যে লিস্টটি পর্ব: ১৬-তে উদ্ধৃত করা হয়েছে, তার ১ থেকে ৪ নম্বরের যোগফল হলো এই মোট ১৯৫৮-টি আয়াত। পুরাকালের নবীদের উপকথার আয়াত সংখ্যার লিস্টটি পর্ব-১৭, হুমকি-শাসানী-ভীতি প্রদর্শন-অসম্মানের আয়াত সংখ্যার লিস্টটি পর্ব: ২৬-২৭ ও অবিশ্বাসীদের অভিশাপ ও বিপথগামী করে হেদায়েত বঞ্চিত-করণ আয়াতগুলো অভিশাপ তত্ত্ব (পর্ব-১১) ও কানে-চোখে-মনে সিলমোহর তত্ত্ব (পর্ব:২১) পর্বে করা হয়েছে। আর হামলা-খুন-সম্পর্কচ্ছেদ সম্বলিত আয়াতগুলো 'ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ' অধ্যায়ের বিভিন্ন পর্বগুলোতে ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে ও এই অধ্যায়ের পরবর্তী পর্বগুলোতেও তা জানতে পারবেন। লেখাটি পড়া, মন্তব্য ও জানার আগ্রহ প্রকাশের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। সঙ্গে থাকুন।

    /গোলাপ

    উত্তর দিনমুছুন